উখিয়ায় পাহাড়ধসে প্রাণহানি: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই টেকসই সমাধান, লেখক: এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
Friday, July 17, 2026
কক্সবাজারের উখিয়ায় টানা ভারী বর্ষণে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে একাধিক রোহিঙ্গা নারী ও শিশুর প্রাণহানির ঘটনা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, যা শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, পরিবেশগত সংকটকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
আমার মতে, এই দুর্ঘটনাগুলোর অন্যতম কারণ হলো পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণ। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির স্থাপনের সময় ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অতিবৃষ্টির সময় আলগা মাটি ধসে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
উখিয়ার পাহাড়গুলো মূলত বালুকাময় ও তুলনামূলক দুর্বল। পাহাড়ের ঢালে হাজার হাজার অস্থায়ী ঘর, শিক্ষা কেন্দ্র, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের কারণে পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে ধসের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু জরুরি ত্রাণ বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, পাহাড়ের ঢাল প্রকৌশলগতভাবে স্থিতিশীল করা, ব্যাপক বনায়ন এবং কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে ক্যাম্পে যেকোনো নতুন অবকাঠামো নির্মাণে কঠোর পরিকল্পনা ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু আশ্রয়শিবিরেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতির কারণে কক্সবাজারের বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, কৃষিজমি এবং স্থানীয় অর্থনীতি নানা ধরনের চাপে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করে বছরের পর বছর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাংলাদেশ একা করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তি এবং মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারের পরিবেশ, পর্যটন, স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক নিরাপত্তা—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে এখন সময় এসেছে একটি বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। পাহাড়ধসের পুনরাবৃত্তি রোধ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং মানবিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা জরুরি।
লেখক: এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম; মহাসচিব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি; চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।



