নয় বছরে সাড়ে চার হাজার মামলায় ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা আসামি

কক্সটিভি নিউজ ডেস্ক::: মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশের অপরাধ কর্মকাণ্ড কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে হত্যা, মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাড়ে চার হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, গত ৯ বছরে ২৮৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৭৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার রোহিঙ্গাকে। মাদকসংক্রান্ত সাড়ে তিন হাজার মামলায় আসামি হয়েছেন ৫ হাজার ৯৩৫ জন। এ ছাড়া অস্ত্র ও দস্যুতার অভিযোগে ১৬৫ মামলায় ৩১২ জন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় ৫২১ জন এবং অপহরণের ৩০৬ মামলায় ৩৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। মানবপাচারের ৪ শতাধিক মামলায় আসামি হয়েছেন ৮৭৯ জন। এর বাইরে বিভিন্ন আইনে আরও শতাধিক মামলা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সশস্ত্র অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের কারণে ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পে এখনো এক ডজনের বেশি অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই সশস্ত্র। এসব চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনকারী ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সিরাজ আমিন বলেন, প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মধ্য থেকে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ ও শনাক্ত করা কঠিন। তবে ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো রয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়ের নয় বছর পূর্ণ হতে চললেও প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর অগ্রগতি নেই। রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এরপর দুই দফা প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ নির্ধারণ হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বরং গত দেড় বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যার চাপ আরও বেড়েছে। বরং গত দেড় বছরে নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যার চাপ আরও বেড়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি এবং নিরাপদে ফেরার অনিশ্চয়তায় রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের একটি অংশ দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়। তাদের মতে, ক্যাম্পে দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবন, অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে নিরাপদ প্রত্যাবাসনই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত না হলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। ফলে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও সমন্বিত সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।