কক্সবাজারে চালু হলো মাদকদ্রব্য অপরাধ দমনে তিন ট্রাইব্যুনাল

কক্সটিভি প্রতিবেদক:: দেশের সর্বদক্ষিণ সীমান্ত জেলা কক্সবাজারে মাদকের আগ্রাসন চলছে। মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা স্থল ও জল সীমান্ত পেরিয়ে নির্বিচারে আসছে ইয়াবা-আইস। প্রতিদিন জেলার স্থল ও জল সীমানায় জব্দ হচ্ছে বিপুল ইয়াবা। এরসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদক মামলা। এরই মধ্যে জেলায় ৫ বছর বা ততোধিক শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রায় ৬ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পর্যটন জেলাকে মাদকের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে কক্সবাজার বিচার বিভাগে তিনটি ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ সৃজন করা হয়েছে। এ ৩টি ট্রাইব্যুনালে শুধুমাত্র ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলার ৫ বছর বা ততোধিক শাস্তিযোগ্য অপরাধের বিচার কার্যক্রম চলবে। কিন্তু নতুন এজলাস করার ব্যবস্থা না থাকায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নিয়ন্ত্রণাধীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত ৩, ৪ ও ৫-এর শাখায় এ তিনটি ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার বিচার বিভাগের জেলা নাজির এম. বেদারুল আলম। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ কক্সবাজার সরকারি কলেজের নারী হোস্টেল দোলনচাপায় এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করেছে সদর থানা পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় শরিফা আকতার নামে ওই শিক্ষার্থীর খাটের নিচে মজুত করা এসব জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছেন থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এ মাদকের চালান ওই শিক্ষার্থীর নিকটাত্মীয় তার কাছে পাঠিয়েছে বলে দাবি করেছেন আটক শিক্ষার্থী। তিনি স্নাতক (সম্মান) গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। শিক্ষক বাবার দেখানো পথে ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের শিক্ষার্থী শাখার কর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। নারী শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এত ইয়াবা জব্দের ঘটনা প্রচার পাওয়ার পর জেলা জুড়ে চাঞ্চল্যের পাশাপাশি সমালোচনা চলছে। একইদিন ভোরে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে প্রাইভেটকারে পাচারকালে ৮৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি কক্সবাজার। এসময় আটক হন এক পাচারকারীও। মেরিন ড্রাইভ সড়কের রামুর খুনিয়াপালংয়ের প্যাঁচারদ্বীপে রেজুখাল চেকপোস্ট এলাকায় তল্লাশিকালে এসব ইয়াবা জব্দ ও পাচারকারীকে আটক করতে সক্ষম হন কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) সদস্যরা, এমনটি জানান ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। এভাবে কক্সবাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে মাদকের মামলা। জট লাগছে, বিচার নিষ্পত্তিতে। সূত্র মতে, গত ৩ সেপ্টেম্বর আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৪ এর জারিকৃত এক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কক্সবাজারের ৩টিসহ সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় মোট ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল সৃজন করা হয়। একইসঙ্গে সৃজিত ট্রাইব্যুনাল গুলোর বিচারিক অধিক্ষেত্রও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অধিক্ষেত্র অনুযায়ী কক্সবাজারের ৩টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল মাঝে ট্রাইব্যুনাল-১-এ টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলা, ট্রাইব্যুনাল-২-এ উখিয়া, সদর, ঈদগাঁও উপজেলা এবং ট্রাইব্যুনাল-৩-এ রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার মাদক সংক্রান্ত অপরাধের মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চলবে। কক্সবাজার জেলা বিচার বিভাগের বিভিন্ন আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে দায়েরকৃত ৫ বছর বা ততোধিক শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রায় ৬ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কক্সবাজার বিচার বিভাগের জেলা নাজির এম. বেদারুল আলম বলেন, গেজেট প্রকাশের ৬০ দিনের মধ্যে বর্তমানে নিয়মিত আদালতে বিচারাধীন ৫ বছর বা ততোধিক শাস্তিযোগ্য অপরাধের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলাগুলো নতুন সৃজিত মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে বলা হয়। নিয়মিত আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলো যে পর্যায় থেকে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হবে সে পর্যায়ে থেকে ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য পরিচালিত হবে। ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪৪(ক) এর ২ ধারা মতে, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারক নতুন সৃজিত মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আরো বলেন, নতুন সৃজিত মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গুলোতে বিচারক, আইন কর্মকর্তা, সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৩-এর আওতায় ট্রাইব্যুনাল-১, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৪-এর আওতায় ট্রাইব্যুনাল-২ এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৫-এর আওতায় ট্রাইব্যুনাল-৩ এর কার্যক্রম চলবে। ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী বাপ্পী শর্মা বলেন, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদক সংক্রান্ত মামলার বিচারের জন্য পৃথক মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা উল্লেখ থাকলেও বিগত সরকারের সময়ে তা হয়ে ওঠেনি। মাদকের আগ্রাসন রোধে বর্তমান সরকারও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করেছে। মাদক পাচার নির্মূলের অংশ হিসেবে স্বল্প সময়ে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন সরকারের রাজনৈতিক কমিটমেন্টের বাস্তবায়নই বলা চলে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান বলেন, কক্সবাজারসহ মাদক চোরাচালান প্রবণ এলাকায় মাদক মামলায় জড়িত অপরাধীদের জন্য পৃথক মাদক ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ায় মাদক অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। সহসা মামলা নিষ্পত্তি হলে সাজায় আটক হবে অপরাধীরা। সাজার এ ম্যাসেজে মাদক চোরাচালান কিছুটা হলেও সংকুচিত হয়ে আসবে। নতুন ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি, সাবেক পিপি, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, মাদকপাচার থামাতে এটি সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। মাদকের আগ্রাসন রোধে ট্রাইব্যুনালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। সূত্র: জাগোনিউজ ২৪