এক মাসে বিদ্যুৎ বিল এলো ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা! মাগুরায় নজিরবিহীন কাণ্ড, ডিজিএমসহ চারজনকে
Wednesday, September 30, 2026
বিশেষ প্রতিনিধি, মাগুরা:
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে অন্যতম এক অবিশ্বাস্য, কৌতুককর অথচ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে মাগুরা জেলায়। জেলার শালিখা উপজেলায় মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পরেও এক সাধারণ গ্রাহকের নামে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত করার মতো এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
হাতে এত বিশাল অঙ্কের বিল পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মাথায় হাত পড়ে ওই গ্রাহক ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের। মুহূর্তের মধ্যে এই ভুতুড়ে ও আজগুবি বিলের কাগজ এলাকার সীমানা পেরিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। নড়েচড়ে বসে বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিনির্ধারক মহলও। এই চরম দায়িত্বহীনতা ও ভুলের দায়ে আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারসহ (ডিজিএম) চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার গভীরে: যেভাবে তৈরি হলো এই আজগুবি বিল
অনুসন্ধানে এবং বিলের কাগজ পর্যালোচনা করে জানা গেছে, মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. আলেয়া খাতুনের আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের বিপরীতে সেপ্টেম্বর মাসের বিলটি ইস্যু করা হয়েছিল।
মিটার রিডিং ও ব্যবহার: বিলের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ আগস্ট মিটারের পূর্ববর্তী রিডিং ছিল ১৬০ এবং ৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান রিডিং দাঁড়ায় ৩৯৫। সেই হিসেবে পুরো এক মাসে ওই গ্রাহকের মোট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে মাত্র ২৩৫ ইউনিট।
প্রকৃত বিল বনাম অবাস্তব বিল: নিয়ম অনুযায়ী, আবাসিক খাতে ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে সব ধরনের কর বাদে প্রকৃত বিল আসার কথা ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৬৩ টাকা, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে বিলম্ব মাশুলসহ সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫৬ টাকা হওয়ার কথা।
কোটি টাকার কারসাজি: কিন্তু মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া জোনাল অফিস থেকে যে বিলটি প্রিন্ট হয়ে আসে, তাতে দেখা যায়—শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট এবং অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে মোট অঙ্ক ঠেকে গিয়ে দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা। শুধু তাই নয়, বিলের কাগজে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যদি এই বিল পরিশোধ করা না হয়, তবে জরিমানা ও বিলম্ব মাশুলসহ মোট টাকার পরিমাণ গিয়ে ঠেকবে ৫৩০ কোটি ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ টাকায়!
গ্রাহক ও স্থানীয়দের চরম প্রতিক্রিয়া
হাতে কোটি কোটি টাকার এই ভুতুড়ে বিল পেয়ে রীতিমতো আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন গৃহকর্ত্রী আলেয়া খাতুন। গণমাধ্যমের সামনে নিজের চরম হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন,
"এটা শুধু কোনো সাধারণ ভুতুড়ে বিল নয়, এটি একটি চরম আজগুবি ও অবিশ্বাস্য ঘটনা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যেখানে মাসের হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়, সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও খামখেয়ালী আচরণের কারণে আমাদের অহেতুক মানসিক দুশ্চিন্তা ও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ধরনের মারাত্মক ভুলের পেছনে যারা জড়িত, তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।"
স্থানীয় সচেতন মহল ও সমাজসেবকরাও এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত ও যাচাইকরণের প্রতিটি ধাপে যদি এমন উদাসীনতা থাকে, তবে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থার জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
কীভাবে ঘটেছিল এই বিশাল ভুল?
ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর টনক নড়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কেন এবং কীভাবে এমন হাস্যকর ও বড় ভুল হলো—তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়।
মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম গণমাধ্যমের কাছে ভুল স্বীকার করে জানান, কিছুদিন আগে ওই গ্রাহকের মিটার পরিবর্তন করা হয়েছিল। মিটার পরিবর্তনের পর সফটওয়্যারে তথ্য এন্ট্রি বা টাইপ করার সময় ভুলবশত মিটারের সিল নম্বরের ডিজিটগুলো সিস্টেমের ডিমান্ড চার্জের ঘরে পোস্টিং বা চলে গিয়েছিল। আর এই সফটওয়্যারজনিত ও টাইপিংয়ের ভুলেই ২৩৫ ইউনিটের বিল চোখের পলকে ৫০৬ কোটি টাকায় রূপ নেয়।
দ্রুত সংশোধন এবং চারজনকে শোকজ
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ত্রুটিপূর্ণ বিলটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করে সংশোধন করা হয় এবং প্রকৃত বিল গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গ্রাহক আলেয়া খাতুন সংশোধিত সেই প্রকৃত বিল (প্রায় দুই হাজার টাকা) ব্যাংকে গিয়ে পরিশোধ করেন।
তবে সাধারণ মানুষকে এভাবে আতঙ্কে রাখার ও দাপ্তরিক কাজে চরম অবহেলার দায়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. মহিতুল ইসলাম জানান, এই মারাত্মক ভুলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম এবং বিলিং সহকারী সোমা রানিসহ মোট চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আনুষ্ঠানিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিকভাবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।



