সেকালের শিশুর কোমরের ঝুনঝুনি আর একালের মোবাইল

গ্রামের বাড়িতে শৈশবে দেখেছি-শিশুদের কোমরে কালু সুতায় ঝুনঝুনি বেঁধে দিত মা-বাবারা। শিশুটি ঘরের আঙ্গিনার যেখানেই যেত ঝুনঝুনির আওয়াজ শুনা যেত। তবে পরিবারের সকল শিশুদের কোমরে ঝুনঝুনি বেঁধে দেয়া হত তা নয়। যেসব শিশু একটু দুরন্ত টাইপের কেবল তাদেরকেই এটা দেয়া হত। শান্তশিষ্ট শিশুদের ঝুনঝুনি দিতে হত না। তখনকার দিনে পরিবারের সদস্যরা সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাত। পরিবারের শিশুটির প্রতি আদার স্নেহ ঠিকই ছিল-কিন্ত সার্বক্ষনিক পাহারা দেয়ার মত পরিবেশ তেমন ছিল না। এক প্রকার এমনই শুনতাম-গড়াগড়ি দিয়ে বড় হলে শিশুরা শক্ত হয়। এখনকার মুরগির ফার্মের মত শিশুদের বড় করার পরিবেশ তখনকার দিনে ছিল না। কারই বা অত সময় আছে যে, শিশুর পেছনে পেছনে দৌঁড়ানোর ? সে তার মত করেই বড় হোক-বেড়ে উঠুক-এমনই ছিল পরিবেশটা। তাহলে কেন ঝুনঝুনি দেয়া হত ? দেয়া হত এ কারণেই যে, শিশুটি উঠানে খেলা করছে আর মা তখন চুলায় রান্না করছে বা তরিতরকারি কুটাটকুটি করছে। মায়ের কান কিন্তু শিশুর ঝুনঝুনির আওয়াজ শুনা যায় কিনা সেদিকে। যখনই ঝুনঝুনির আওয়াজ শুনা যেত না তখনই মা দ্রুত বের হয়ে এদিক- সেদিক দেখত। দেখে যে, ততক্ষণে শিশুটি ভিটার সীমানা পেরিয়ে বাইরে অথবা পুকুর পাড়ে চলে গেছে। সেখান থেকে নিয়ে এসে আবার ঘরের উঠোনে খেলা করার জন্য ছেড়ে দেয়া হত। অর্থাৎ শিশুটি যাতে বড় দুর্ঘটনায় না পড়ে অক্ষত থাকার সুবিধার্থেই ঝুনঝুনির ব্যবহার প্রচলন ছিল। আমাদের গ্রামের বাড়িতে বড় গরুর গোয়াল ছিল। গোয়ালের দুয়েকটা গরুর গলায়ও রশি দিয়ে ঝুলানো ছিল ঘন্টি। গরুর ঝাঁক যখন গোয়াল থেকে চরানোর জন্য বের করা হত তখন গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ শুনা যেত গরুর গলায় ঝুলানো কাঠের বাক্সের ঘন্টি। অনেক গরুর গলায় অবশ্য পিতলের তৈরি বড় আকারের ঘন্টিও দেয়া হত। তাও দুষ্টু প্রকৃতির গরুগুলোর গলায় ঝুলানো হত এসব ঘন্টি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু-কিশোর নিখোঁজ-অপহরণ এবং হত্যার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে। গত ৭ মাসে দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিঁখোজের তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে। তন্মধ্যে ইতিমধ্যে ১২/১৩ হাজার শিশু-কিশোর উদ্ধার বা ফিরে আসার তথ্যও রয়েছে। বাদবাকিরা রয়েছে নিখোঁজের তালিকায়। আবার ইতিমধ্যে কয়েক’শ শিশু হত্যার খবরও রয়েছে। এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম। সেকালে শৈশবে শিশুদের কোমরে ঝুলানো ঝুনঝুনির যে এত গুরুত্ব ছিল তা বুঝতাম না। কিন্তু এখন উপলদ্ধি করছি- সেই এনালগ যুগে শিশুর কোমরের ঝুনঝুনি কত বিপদ-আপদ থেকে পরিবার আর সমাজকে রক্ষা করত। ঝুনঝুনির কারণে একটি শিশু পুকুরের পানিতে পড়া থেকে রক্ষা পেত। রক্ষা পেত আগুনে পড়া থেকে। ছেলেধরাদের হাত থেকে রক্ষা পেত। ঝুনঝুনি ছিল সেকালের বিপদ-আপদের যেন মহৌষধ। একালে ঝুনঝুনি নেই। ঝুনঝুনির বদলে এসেছে মোবাইল। বিপদ-আপদের মুখে পড়লে মা-বাবাকে জানাতে সুবিধার জন্যই দেয়া হয় মোবাইল। অথচ সেই মোবাইলই ডেকে আনছে যত সর্বনাশ। কুমিল্লার অপ্রতিম তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আরো প্রমাণ কক্সবাজারের উখিয়ার আবুল কাশেম-নূর জাহান উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র মছুদ মোহাম্মদ আরবিত। কিশোর ছাত্র আরবিতকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আইফোন দেয়ার প্রলোভনে আপহরণ করেছিল। দীর্ঘ ২ মাস ২৪ দিন পর অপহরণকারিদের বন্দিশালা থেকে সে ফিরে এসেছে। আর কুমিল্লার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করেছে। তাহলে এসবের সমাধান কিসে ? নাকি আবার পেছনে ফিরে সেকালের ঝুনঝুনির সংষ্কারের কথা ভাবতে হবে সমাজকে? লেখক সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার-২১--০৯--২০২৬