মুক্তিযুদ্ধকে পরাজিত করার ‘শেল্টার মাস্টার’ ছিলেন ড. ইউনূস
Wednesday, March 25, 2026
চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকের আসল রূপ বেরিয়ে আসতে শুরু করে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেটি শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে। মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তাদের কুৎসিত চেহারাটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
এমনকি একসময়ের জামায়াত বলতে শুরু করে, আমরা যারা একাত্তরে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম, তাঁরা আল্লাহর কাছে মাফ চাক।
বিএনপিসহ সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছিলাম। ভেবেছিলাম শেখ হাসিনা চলে যাবে, এরপর একটি নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র চালাবে। অথচ পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, জামায়াত ও তাদের ছেলেপেলেরা এই আন্দোলনটিকে কুক্ষিগত করতে শুরু করেছে। তারা বলতে শুরু করল, শুধু একটা ইলেকশনের জন্য আন্দোলন হয়নি।
তারা আন্দোলন করেছে সংস্কারের জন্য। আর সেই সংস্কারটা হলো ১৯৪৭ ও ২০২৪ মূল স্বাধীনতা। মানে ১৯৭১ ছিল একটা ‘গণ্ডগোল’। সেই একাত্তরকে তারা স্বীকার করে না।
ইন্ডিয়া তখন নাকি ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানকে ভেঙে দিয়েছে! তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চাইল। কারণ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত থেকে পরের ৯ মাস পাকিস্তান আমাদের ওপরে যে নির্মম, নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়েছিল, তার মূল সহযোগী ছিল গোলাম আযমের নেতৃত্বে রাজাকাররা। তারা এ দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করতে সহযোগিতা করেছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে মানুষের বাড়িঘর চিনিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানিরা দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত কেড়ে নিয়েছিল।
আমরা যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত করলাম এবং রেসকোর্স ময়দানে একটা চুক্তি হলো। সেই চুক্তি অনুযায়ী আলবদর, রাজাকার, আলশামস এবং জামায়াত, মুসলিম লীগকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তারা সেটা মানতে পারেনি। এখন যাদের দেখা যাচ্ছে, তারা তাদের পূর্বপুরুষের সেই গ্লানি ভুলতে পারেনি। এই সাপের দল ৫৪ বছর ধরে অত্যন্ত নীরবে-নিভৃতে কোনো সময় আওয়ামী লীগের সহযোগিতায়, কখনো অন্যদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে বড় হলো। ৫৪ বছর পরে এসে এই সাপের দল গোল দেওয়ার চেষ্টা করল। এখন পর্যন্ত তারা সেই গোল দেওয়ার অবস্থানের মধ্যেই আছে।
এরই মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। অথচ ওরা মনে করেছিল, নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় আসবে। আমি তখন বলছিলাম, সেটা হলে আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব। কারণ এই দেশের নাম যদি বাংলাদেশ হয়, তাহলে কিছুতেই রাজাকার, আলবদররা কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না।
এই দেড় বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় যখন জুতার মালা দেওয়া হলো, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো ভেঙে ফেলা হলো, তখন আমার হৃদয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়েছে। মনে হয়েছিল, আমি বাঁচব না। তবে পরে প্রতিবাদের জন্য নিজেকে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি করলাম এবং সংশপ্তকের ভূমিকা পালন করলাম। মনে হলো, এদের পরাজিত করার জন্য আমাদের মতো লোকজনের বেঁচে থাকা দরকার। আবারও বলি, মুক্তিযোদ্ধারাই জয়ী হবে, মুক্তিযুদ্ধই জয়ী হবে। যতই আলবদর, রাজাকাররা স্বাধীনতার বিরোধী হোক, মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ী হবেই হবে।
আল্লাহকে সাক্ষী রেখে ২৬ মার্চ সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধের নামে শপথ করে এটা আমি বলছি। আমি কোরআন শরিফে হাত রেখে শপথ করে যুদ্ধ করতে নেমেছিলাম। সেই শপথ করে আবারও বলছি, মুক্তিযুদ্ধের কাছে আলবদরের মধ্যযুগীয় বর্বররা পরাজিত হবেই।
ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক মানের একজন চক্রান্তকারী। তাঁর আমলে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আক্রমণকে আমি বলব ‘শ্যাডো অব ইউনূস’, অর্থাৎ সরকারের ছায়াতলে ঘটনাগুলো ঘটেছে। তিনি ছিলেন এগুলোর মূল ‘শেল্টার মাস্টার’।
ড. ইউনূসের সময় মব সৃষ্টি করে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। ২৬ মার্চ পালন করতে দেয়নি। ১৬ ডিসেম্বর উদযাপন করতে দেওয়া হয়নি। ইউনূস সরকারের মতো এত খারাপ কাজ কেউ করেনি। বাংলাদেশে ৫৪ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধটাকেই ধ্বংস করে পরাজিত করার চেষ্টা হয়েছে।
এখন সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এই দলে অনেক ধরনের লোকজন আছে, কিন্তু এই দলের নেতা হলেন জিয়াউর রহমান। ফলে শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্ভর করেই রাজনীতি করতে হবে এবং বাঁচতে হবে। আগামী দিনে বিএনপিকে এই দেশে টিকে থাকতে হলে এবং দীর্ঘদিন দেশ পরিচালনা করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপরে নির্ভর করেই তা করতে হবে। যতই তারা কম্প্রোমাইজ করুক, এর বাইরে অন্য কোনো পথ নেই।
আমি চাই দেশটা বাংলাদেশ থাকুক, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে চলুক। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমি চাই, আজকের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সেই স্বাধীনতার পক্ষে অবিচল থাকুক।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংসদ সদস্য



