রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মজীবীদের দিনব্যাপী বাস্তবতা: দায়িত্ব, চাপ ও মানবিক চ্যালেঞ্জ
Saturday, April 18, 2026
ওমর ফারুক উখিয়া-কক্সবাজার;
ভোরের আলো ফুটতেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শুরু হয় আরেকটি ব্যস্ত দিন। সকাল ছয়টা বাজতে না বাজতেই বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবীরা প্রস্তুত হন দিনের দায়িত্ব পালনের জন্য। কেউ স্বাস্থ্যসেবায়, কেউ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনায়, কেউ শিক্ষা কার্যক্রমে-সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে একটি বড় মানবিক ব্যবস্থাকে সচল রাখার চেষ্টা করেন।
তবে দিনের শুরুটা অনেকের জন্যই সহজ হয় না। ক্যাম্প এলাকায় যাওয়ার পথে যানবাহনের তীব্র জ্যাম নিত্যদিনের সঙ্গী। সরু রাস্তা, অতিরিক্ত যানবাহন আর অপরিকল্পিত চলাচলের কারণে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই বের হয়েও অফিসে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বাড়ে, অনেকেই দেরি হওয়ার অস্বস্তি ও শঙ্কা নিয়ে দিন শুরু করেন।
ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক লড়াই। ধুলাবালি, কাদা আর প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে কাজ করতে হয়। স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর চিকিৎসা দেন, যেখানে সময় ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পানি ও স্যানিটেশন খাতে কর্মরতরা নিরাপদ পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকেন-যেখানে সামান্য ত্রুটিও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষা খাতে নিয়োজিতরা অস্থায়ী লার্নিং সেন্টারে শিশুদের পড়ান। সীমিত উপকরণ আর অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যেও তারা শিশুদের মাঝে স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সবসময় সতর্ক থাকতে হয়, কারণ ছোট কোনো সমস্যাও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলেও কাজের চাপ কমে না। মাঠপর্যায়ের কাজ শেষে রিপোর্ট তৈরি, তথ্য সংগ্রহ, মিটিং,-সবকিছুই দিনের অংশ। অনেক সময় নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরেও কাজ করতে হয়।
এই সব কিছুর মাঝেই আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে-অল্প বেতনের চাপ। অনেক কর্মীই অভিযোগ করেন, তাদের কাজের পরিমাণ ও ঝুঁকির তুলনায় বেতন খুবই সীমিত। পরিবার চালানো, যাতায়াত খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়-সব মিলিয়ে মাস শেষে আর্থিক টানাপোড়েন থেকে যায়। তবুও জীবিকার তাগিদে এবং মানবিক দায়বদ্ধতায় তারা এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরার পথেও আবার সেই যানজট, ধুলা আর দীর্ঘ যাত্রা। শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক চাপও থেকে যায়-কারণ প্রতিদিনই তারা দেখেন অসহায় মানুষের জীবনসংগ্রাম।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এসব চাকরিজীবীদের জীবন শুধু একটি চাকরি নয়; এটি প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে টিকে থাকার গল্প। যানজটের ভোগান্তি, সময়মতো অফিসে পৌঁছানোর চাপ, সীমিত বেতন এবং কঠিন কর্মপরিবেশ-সবকিছুর মাঝেও তারা মানবতার সেবায় অবিচল। তাদের এই নিরলস প্রচেষ্টার ওপরই নির্ভর করে ক্যাম্পের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা সচল থাকা।



