টেকনাফ ও ইনানী থেকে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রা: আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি,উদ্ধার ৯, নিখোঁজ ২ শতাধিক
Sunday, April 12, 2026
নিজস্ব প্রতিবেদক::
সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রলার আন্দামান সাগরের কাছে ডুবে যাওয়ার পর ভাসমান অবস্থায় রোহিঙ্গাসহ ৯ জনকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি ও ৩ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফের নোয়াখালী ও রাজারছড়া এলাকা থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে তাদের একটি বড় ট্রলারে তোলা হয়। প্রায় আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। আট দিনের মাথায় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।
বেঁচে ফেরা একাধিক যাত্রীর ভাষ্য মতে ট্রলারে নারী-শিশুসহ প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল। দুর্ঘটনার পর তারা পানির বোতল ও তেলের ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভাসতে থাকেন। পরে একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। তবে বাকি যাত্রীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
উদ্ধার যাত্রীদের মধ্যে ফেরত আসা উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গত ৪ এপ্রিল আমাকে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাজারছড়া এলাকার একটি পাহাড়ে বন্দী করে রাখা হয়, যেখানে আরও ৫০-৬০ জন লোক ছিল। গভীর রাতে আমাদের একটি কার্গো বোটে তোলা হয়। সেখানে গিয়ে দেখি ক্যাম্পের পরিচিত কয়েকজনসহ প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টানা আট দিন সাগরে চলার পর ৯ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছাই। এসময় মাঝি ও তার লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সবাইকে জিম্মি করে বোটের বরফঘরে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পরই বোটটি ডুবে যায়। তখন আমি ও আরও কয়েকজন পানির বোতল ও তেলের ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে ভাসতে থাকি। পরে ১১ এপ্রিল একটি বাংলাদেশি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।’
রফিকুল ইসলাম জানান, ট্রলারটিতে মাঝিসহ প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল, যার মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। বাকিদের কী হয়েছে, তা আমি জানি না।
টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার ফেরত আসা সোহান উদ্দিনের বাবা শামসুর আলম বলেন, ‘এলাকার এক বন্ধু এনায়েত খেলার কথা বলে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। এরপর সে নিখোঁজ ছিল। পরে জানতে পারি, দালালের কাছে বিক্রি করে তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। শনিবার রাতে থানা থেকে খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে আমার ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পাই। তার সঙ্গে নারীসহ আরও আটজন ছিল, সবার অবস্থাই ছিল খুবই নাজুক।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাগর থেকে তাদের উদ্ধার করে থানায় আনা হয় এবং পরে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো রোহিঙ্গাদের ছেড়ে দিলেও স্থানীয়দের দালাল হিসেবে আসামি করা হয়েছে।’
অন্যদিকে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ফেরত আসা মো. ইমরান বলেন, ‘ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে বন্ধুদের সঙ্গে আমিও যাত্রা করি। কিন্তু আন্দামান সাগরের কাছাকাছি পৌঁছালে আমাদের ট্রলারটি ডুবে যায়। পরে পানির ট্যাংকি ধরে দুই দিন সাগরে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করি। এরপর একটি বাংলাদেশি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে।’
তিনি বলেন, ‘এত মানুষ মারা গেছে ভাবতেই পারছি না। এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা খুব কষ্টের। এখনও আমি অসুস্থ আছি। আদালতের মাধ্যমে আজ বাড়ি ফিরেছি।’
এদিকে কোস্ট গার্ড বাদী হয়ে টেকনাফ মডেল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলার তথ্যমতে, ‘তানজিনা সুলতানা’ নামের বোটে করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী এসব যাত্রী বৈরী আবহাওয়ায় ট্রলারডুবির শিকার হয়।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে থানায় আনা হয়। প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভিকটিমদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে শনিবার বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা সাব্বির আলম সুজন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এম টি মেঘনা প্রাইড গত ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিকট ডুবে যায়। পরে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৯ বাংলাদেশিকে (৮ পুরুষ ও ১ নারী) উদ্ধার করে। পরে মধ্যরাতে উদ্ধারকৃতদের কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ মনসুর আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ভাসমান অবস্থায় উদ্ধারকৃতরা হলেন- মো. ইমরান, রাহেলা বেগম, হৃদয়, সোহান উদ্দিন, মো. আকবর, রফিকুল ইসলাম, তোফায়েল, সায়াদ আলম ও মো: হামিদ।



