ত্বকের যে ৭ লক্ষণ দেখলেই বুঝবেন আপনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত

মানুষের শরীরের ভেতরের অনেক সমস্যার প্রভাব ত্বকে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বক অনেক সময় শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের একটি আয়নার মতো কাজ করে। তাই ত্বকের কিছু পরিবর্তন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই সতর্ক সংকেত দিতে পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে এবং এটি এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সাধারণভাবে অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঝাপসা দেখা ডায়াবেটিসের পরিচিত লক্ষণ। তবে অনেক সময় ত্বকেও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যা ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হতে পারে। অবশ্য এসব লক্ষণ একা দেখলেই যে ডায়াবেটিস হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা গেলে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। কেন ডায়াবেটিসে ত্বকে পরিবর্তন দেখা যায় ডায়াবেটিসের সঙ্গে ত্বকের সম্পর্ক মূলত রক্ত সঞ্চালন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে শরীরের ছোট রক্তনালি ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ত্বকে রক্ত প্রবাহ কমে যায় এবং নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। নিচে ত্বকে দেখা দিতে পারে এমন ৭টি সাধারণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো। ডায়াবেটিক ডার্মোপ্যাথি বা শিন স্পট ডায়াবেটিসের কারণে অনেকের পায়ের নিচের অংশে ছোট গোলাকার বাদামি বা লালচে দাগ দেখা যায়। এগুলোকে শিন স্পট বলা হয়। সাধারণত এটি ব্যথা বা চুলকানি সৃষ্টি করে না। এ ধরনের দাগ মূলত ছোট রক্তনালির পরিবর্তনের কারণে হয়। অনেক ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে এই লক্ষণ দেখা যায়। অ্যাকানথোসিস নাইগ্রিকানস গলা, বগল, কুঁচকি বা আঙুলের গাঁটে যদি গাঢ় রঙের মোটা ও মখমলের মতো ত্বক দেখা যায়, তাহলে সেটি অ্যাকানথোসিস নাইগ্রিকানস হতে পারে। এটি অনেক সময় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই ধরনের ত্বকের পরিবর্তন বেশি দেখা যায়। ক্ষত ধীরে সারা কোনো কাটাছেঁড়া বা ক্ষত যদি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক দেরিতে সারে, তাহলে সেটি ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালি ও স্নায়ুর ক্ষতি হয়। এতে ক্ষতস্থানে রক্ত, অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছাতে সমস্যা হয় এবং ক্ষত সেরে উঠতে বেশি সময় লাগে। বারবার ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে ত্বকে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সহজে হতে পারে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় - দাদ - ক্যান্ডিডা সংক্রমণ (ছত্রাক বা ইস্টের অত্যধিক বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট সংক্রমণ) - ফোঁড়া - ত্বকের পুঁজভরা ফোলা ত্বক শুষ্ক ও চুলকানি রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে শরীর থেকে পানি বের হয়ে যেতে পারে। এতে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং চুলকানি দেখা দেয়। এ ছাড়া ছোট রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ত্বকে ঘাম ও তেলের উৎপাদন কমে যায়। এতে ত্বক আরও বেশি শুষ্ক হয়ে পড়ে। নেক্রোবায়োসিস লিপয়েডিকা এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্বকের লক্ষণ। সাধারণত পায়ের নিচের অংশে চকচকে লালচে, বাদামি বা হলদে দাগ দেখা যায়। কখনো কখনো এসব জায়গার ত্বক পাতলা হয়ে যায় এবং আঘাত পেলে সেখানে ঘা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। ভিটিলিগো ভিটিলিগো এমন একটি ত্বকের সমস্যা যেখানে ত্বকের কিছু অংশের রং হারিয়ে যায় এবং সাদা দাগ তৈরি হয়। এটি মূলত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে হয়। টাইপ ১ ডায়াবেটিস যেহেতু একটি অটোইমিউন রোগ, তাই এ ধরনের রোগীদের মধ্যে ভিটিলিগো বেশি দেখা যেতে পারে। আবার টাইপ ২ ডায়াবেটিসেও দীর্ঘদিনের বিপাকীয় চাপ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে এটি দেখা দিতে পারে। কেন দ্রুত শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ অনেক সময় ত্বকের এসব লক্ষণ ডায়াবেটিস ধরা পড়ার আগেই দেখা দেয়। তাই এসব পরিবর্তন লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের মধ্যে ডায়াবেটিস শনাক্ত করা গেলে অনেক জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন : - স্নায়ু ক্ষতি - চোখের সমস্যা - হৃদরোগের ঝুঁকি কী করবেন ত্বকে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। কিছু বিষয় মেনে চললে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। - ত্বকে নতুন বা অস্বাভাবিক দাগ বা পরিবর্তন হলে খেয়াল রাখুন - দীর্ঘদিন ক্ষত না সারলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন - রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন - সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করুন ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ত্বকের ছোট ছোট পরিবর্তনও অনেক সময় বড় স্বাস্থ্য সমস্যার আগাম সতর্ক সংকেত হতে পারে। তাই ত্বকের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র : এনডিটিভি