রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রক্তপাত থামছেনা; ১৮ ঘণ্টায় দুই নেতা নিহত, আধিপত্য ও ‘টার্গেট কিলিং’ আতঙ্ক

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফের রক্তপাত: ১৮ ঘণ্টায় নিহত দুই নেতা, আধিপত্য ও ‘টার্গেট কিলিং’ আতঙ্ক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন শঙ্কা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ স্থানীয়দের
শফিউল শাহীন, কক্সটিভি::: কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সশস্ত্র আধিপত্য বিস্তার ও টার্গেট কিলিং গ্রুপ। মাত্র ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই রোহিঙ্গা নেতা হত্যার ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ক্যাম্পজুড়ে। নিহতদের পরিবার ও একাধিক ক্যাম্পবাসী অভিযোগ তুলেছেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন আরএসওর কিছু কমান্ডার ও সদস্য এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ক্যাম্পে দীর্ঘদিন পর আবারও সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির ইঙ্গিত নয়, এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক বিস্তার ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। গত ৫ মে রাতে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের তর্জা ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন (এআরও) সংশ্লিষ্ট নেতা কেফায়েত উল্লাহ প্রকাশ আব্দুল হালিম। ঘটনার পরপরই ক্যাম্পজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের স্বজনরা প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও স্থানীয়দের অনেকে সন্দেহের তীর ছুড়েছেন আরএসও'র দিকে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার ঠিক একদিন পর, ৬ মে দুপুর আড়াইটার দিকে বালুখালী ক্যাম্প-৮ ইস্টের মাঝি মোহাম্মদ কামাল প্রকাশ হাজী জোস কামালকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগে থেকে ওৎপেতে থাকা অস্ত্রধারীরা টমটম গাড়িতে থাকা অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত জোস কামালের পরিবার সরাসরি অভিযোগ করে দাবি করেছে, আরএসওর কয়েকজন কমান্ডার ও সদস্য পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নিহতের ছোট বোন হালিমা ও স্ত্রী জানান, তাদের বড় ভাই নবী হোসেন বর্তমানে মিয়ানমারে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই বিরোধের জের ধরে আরএসও নামে একটি স্ব শস্ত্র গ্রুপ আরাকান আর্মি পক্ষ নিয়েছে, গোষ্ঠীটি তাদের পরিবারকে টার্গেট করেছে বলে অভিযোগ তাদের। তাদের দাবি, “দুইজনকে হত্যা করতে পারলে ৪০ লাখ টাকার কিলিং মিশন” বাস্তবায়নের প্রস্তাবের কথা তারা আগেই জেনেছিল। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে নতুনভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রায় ৯ বছরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র সংঘর্ষে ৩০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। তবে গত দুই বছরে গোয়েন্দা সংস্থা, এপিবিএন, বিজিবি ও র‍্যাবের কঠোর নজরদারিতে ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড ও গোলাগুলির ঘটনা অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এই দুই হত্যাকাণ্ড নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রোহিঙ্গা জানান, ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘটিত দুই হত্যাকাণ্ড একই ধরনের “টার্গেট কিলিং মিশন”-এর অংশ হতে পারে। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে অপহরণ, মাদক কারবার, বিশেষ করে ইয়াবা পাচার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। প্রতিনিয়ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীরা আটক হলেও মূল নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয় রয়েছে। উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অপহরণ, ইয়াবা কারবারের পর এখন আবার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা ঘটছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে দাবী সচেতন মহলের। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী ক্যাম্প পরিদর্শনকালে অন্য ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেলে তা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য নয়, বহুল আলোচিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও জটিল করে তুলছে। এ বিষয়ে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর পুলিশ সুপার জানান, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে। অন্যদিকে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “ক্যাম্পকেন্দ্রিক ইয়াবা কারবার ও সশস্ত্র তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চেকপোস্টে তল্লাশি জোরদার ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।” সচেতন মহলের দাবি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার না করলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এমন বাস্তবতায় ক্যাম্পে শীগ্রই যৌথ অভিযান জরুরি মনে করছেন তারা।