ভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার; ৭৩ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি নুরুল হুদা চৌধুরী

আহসান সুমন, কক্সবাজার : ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্রহত্যার খবর কক্সবাজারে প্রথম এসে পৌঁছায় মহকুমা প্রশাসক মৌলভী গফুরুজ্জামান চৌধুরী টেলিফোনে। সেখান থেকে খবর পান তৎকালীন সিএন্ডবি প্রকৌশলী এস আর খান। তার ভাগ্নে কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র খালেদ মোশাররফের কাছে পৌঁছাতেই তিনি সে খবর তার স্কুলের সহপাঠীদের কাছে পৌঁছে দেন। এসময় মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ নিজেই উদ্যোগী হয়ে কক্সবাজার হাইস্কুলে সহপাঠীদের সংগঠিত করেন। এই খবর শোনামাত্র বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। মিছিলে নেতৃত্বে দেন খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাসী ও নুরুল হুদা চৌধুরী।   মিছিল শেষে শহরের বাহারছড়ায় ছাত্র জনতার অংশগ্রহণে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাসী, সালামত উল্লাহ, নুরুল হুদা ও আমিরুল কবির চৌধুরী। ২২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহরের বটতলায় এক অনির্ধারিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন ছাত্ররা ছাড়াও রাস্তায় নেমে আসে কক্সবাজারের সর্বস্তরের জনতা। ২৩ ফেব্রুয়ারি মিছিলের নগরীতে পরিণত হয় গোটা কক্সবাজার। আগের দিনের চেয়ে এদিন জনতার মিছিল ছিল কয়েকগুণ বেশি। সমস্ত কক্সবাজার মিছিলের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে। এদিন ছাত্র-জনতার মিছিল নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়। সমাবেশ পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করার জন্য বিকেলে কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় খালেদ মোশাররফ, আখতারুজ্জামান চৌধুরী, নুরুল হুদা চৌধুরী ও নাসির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। সভা চলাকালীন এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল। তিনি প্রথমে নুরুল হুদা চৌধুরীকে আটক করেন। কিছুক্ষণ পর বাদশা মিয়া চৌধুরী, প্রফেসর মোস্তাক এবং এখলাস খালাসিও আটক হন। এ ঘটনায় সেই সভা পণ্ড হয়ে যায়। যদিও আটকের পরেরদিন রাতে নুরুল হুদা চৌধুরীসহ আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত দালিলিক ইতিহাস এগুলো। কিন্তু এতোসব ত্যাগ, আন্দোলন সংগ্রামের মাঝে দীর্ঘ ৭৩ বছরেও অনেকেই ভাষা সৈনিক স্বীকৃতি পাননি। সরাসরি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেফতার হয়েও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যারা পাননি তাদের মধ্যে অন্যতম নুরুল হুদা চৌধুরী। যিনি ইন্তেকাল করেছেন ২০২০ সালে। গত হওয়ার ৫ বছর পর অন্তত: মরনোত্তর হলেও ভাষা সৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু চান ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব নুরুল হুদার সহধর্মিনী আক্তার বেগম। একটি অঞ্চলের মানুষের ভাষার অধিকার রক্ষার নীরব লড়াই কক্সবাজারের এই ভাষা আন্দোলন। যেখানে ছিল না বড় মঞ্চ, ছিল না আলো ঝলমলে প্রচার। ছিল শুধু মায়ের ভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই আন্দোলনের প্রতিটি অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়-ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, ভাষা হলো আত্মপরিচয়, মর্যাদা আর অস্তিত্বের চিহ্ন। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, কিছু ইতিহাস মানুষের রক্তে, ঘামে আর অশ্রুতে লেখা থাকে। যুগ যুগ ধরে সেই ইতিহাসকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীত খোঁজা নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছেও দায়বদ্ধ থাকা। তাইতো আজও সবার মুখে মুখে শুনি, "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি..? সাগর পাড়ের শহর কক্সবাজারের ভাষা আন্দোলনে মিছিল সংগ্রামের সারথি সকল সাহসী মানুষদের প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা।