কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনে সৌন্দর্য আছে, সেবার পূর্ণতা নেই

রাতে ঢাকা থেকে ট্রেনে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা। সকালে কক্সবাজার রেলস্টেশনে নামা। সেখানে লকারে ব্যাগেজ রেখে সারা দিন সমুদ্র সৈকতসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘোরাঘুরি। রাতে স্টেশনে ফিরে ব্যাগেজ বুঝে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেনে চড়ে বসা। কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন নির্মাণের অন্যতম পরিকল্পনা ছিল এমন। দীর্ঘ ছুটি কিংবা সময় মেলানো নিয়ে ঝামেলা এড়িয়ে দিনব্যাপী যেন ভ্রমণ করে গন্তব্যে ফিরে আসা যায়, সেজন্য এমন পরিকল্পনা নিয়ে নির্মাণ শুরু হয়েছিল রেলস্টেশনটির। তবে স্টেশন উদ্বোধনের আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। চালু হয়নি লাগেজ লকার। স্থবির হয়ে আছে শপিংমল, রেস্তোরাঁসহ অধিকাংশ বাণিজ্যিক কার্যক্রম। প্রায় ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রী ও পর্যটকরা। কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা জানার ঘোনা এলাকায় ২৯ একর জমির ওপর নির্মিত আইকনিক রেলস্টেশনটি দূর থেকে নজর কাড়ে। প্রায় এক লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের ছয়তলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনটিতে রয়েছে তথ্যকেন্দ্র, যাত্রী লাউঞ্জ, মসজিদ, শিশুদের খেলার জায়গা, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, শিশু যত্নকেন্দ্র, ২৯ কক্ষের তারকামানের হোটেল, কনফারেন্স হল, বাণিজ্যিক স্পেস ও প্রশাসনিক কার্যালয়। ঝিনুক আকৃতির ফোয়ারা, প্রশস্ত পার্কিং ও আধুনিক স্থাপত্যের কারণে এটি দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর উদ্বোধনের পর কক্সবাজারে নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হলেও স্টেশন ভবনের পরিকল্পিত সব সেবা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুবিধাগুলোর একটি ছিল লাগেজ লকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সকালে স্টেশনে নেমে পর্যটকরা লাগেজ নিরাপদে রেখে সারা দিন কক্সবাজার ঘুরে রাতে ট্রেনে ঢাকায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু উদ্বোধনের আড়াই বছর পরও সেই লকার চালু হয়নি। একই সঙ্গে শপিং মল, রেস্টুরেন্টসহ অধিকাংশ বাণিজ্যিক সুবিধাও চালু হয়নি। তারকামানের হোটেলসহ পরিকল্পিত বিভিন্ন সেবা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় স্টেশন ভবনের বড় একটি অংশ এখনো কার্যত অব্যবহৃত। যাত্রী ইয়াছিন আরাফাত বলেন, আইকনিক রেলস্টেশনে যেভাবে সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে সেভাবে নেই। বিশেষ করে অপেক্ষমাণ কক্ষে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় গরমের মধ্যে যাত্রীদের কষ্ট করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুত সুবিধাগুলো যথাযথভাবে চালু করা গেলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যাত্রী সিরাজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের ব্যাগ রাখার জন্য স্টেশনে লকারের ব্যবস্থা থাকা দরকার ছিল। কিন্তু এখানে এসে সে ধরনের কোনো সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। শরিফুল ইসলাম বলেন, লকারে ব্যাগ রাখার ব্যবস্থা, পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত হোটেলসহ যেসব সুবিধা থাকার কথা ছিল, তার অনেক কিছুই এখনো নেই। লিফটও ঠিকমতো চলাচল করে না। সব মিলিয়ে স্টেশনটি যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, এখনো সেভাবে হয়নি। বাণিজ্যিক সুবিধার পাশাপাশি স্টেশনের যাত্রীসেবার মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অপেক্ষমাণ কক্ষে অপর্যাপ্ত ফ্যান, লিফট ঠিকমতো না চলা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর না থাকার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন যাত্রী। যাত্রী আব্দুর রহমান বলেন, কক্সবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি আশীর্বাদ। বিশ্বের দীর্ঘতম বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের পাশে নির্মিত আইকনিক রেলস্টেশনটি পর্যটকদের জন্য পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা জরুরি। তিনি বলেন, জনগণের অর্থে নির্মিত এই স্টেশনের সব সেবা দ্রুত চালু করে পর্যটকবান্ধব ও জনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একজন পর্যটক যেন কক্সবাজারে এসে নিজেকে সম্মানিত অতিথি মনে করেন, সেভাবেই স্টেশনটির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। এলিনা হক আরেক যাত্রী বলেন, কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা আসেন। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা, যাতায়াত ও সুযোগ-সুবিধা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। ট্রেন যোগাযোগের মতো উদ্যোগগুলো যেন মানুষ সহজে ও নির্বিঘ্নে ব্যবহার করতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, উন্নয়ন কোনো একটি সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এসব সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি পর্যটকের আগমনও বাড়তে পারে, যা দেশের পর্যটনশিল্প ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। যাত্রী জাবেদ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব রেলস্টেশন রয়েছে, তার মধ্যে কক্সবাজার রেলস্টেশনটি আন্তর্জাতিক মানের। তবে এখানে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা ছিল, তার কিছু এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। তিনি বলেন, চলন্ত সিঁড়ি, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের মতো সুবিধা দ্রুত চালু করা গেলে যাত্রী ও পর্যটকদের জন্য যাতায়াত আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হবে।