উখিয়ায় অপহরণের দেড় মাসেও সন্ধান মিলেনি স্কুল ছাত্র আরবিতের; কাঁদছেন মা-বাবা এক আসামি কারাগারে, অপরজন আত্মগোপনে: তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন?
Wednesday, August 26, 2026
বিশেষ প্রতিবেদক ::
কক্সবাজারের উখিয়ায় রাজাপালং আবুল কাশেম নুর জাহান উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মছুদ মোহাম্মদ আরবিত (১৫) নিখোঁজ হওয়ার দেড় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি এখনো।
আদরের সন্তানকে হারিয়ে পিতা-মাতার চোখে এখন ঘুম নেই। সন্তান জীবিত বা নিরাপদ আছে কি না এই উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের।
ভুক্তভোগীর মা কাজল আকতার বাদী হয়ে গত চলতি বছরের ১৭ জুলাই উখিয়া থানায় জিআর মামলা নং-৪১২/২৬ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।
মামলায় দুই জনকে আসামি করা হয়।
যেখানে অজ্ঞাত অভিযুক্ত আরও ২/৩ জন।
মামলার একজন আসামি বর্তমানে কারাগারে থাকলেও অপর আসামি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
নিখোঁজ মছুদ মোহাম্মদ আরবিত উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জাফরপল্লান পাড়া এলাকার বাসিন্দা আফাজ উদ্দিনের ছেলে।
সে রাজাপালং আবুল কাশেম নুর জাহান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র।
যেভাবে নিখোঁজ :
মামলার এজাহার ও পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৫ জুন ২০২৬ দুপুরে কোটবাজার এলাকা থেকে আরবিত নিখোঁজ হয়। তাকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, নিখোঁজ হওয়ার আগে মামলার ১ নম্বর আসামি বিভিন্ন সময় আরবিতকে আইফোন, টাকা-পয়সাসহ বিভিন্ন উপহার ও প্রলোভন দিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। আসামিদের বিরুদ্ধে হিজড়া ও সমকামীতার সাথে জড়িত বলে প্রচার আছে। এ বিষয়ে স্থানীয় ভাবে একাধিক নালিশ বিচারও হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের আরও অভিযোগ, ১ নম্বর আসামির বাবা তার ছেলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কিন্তু সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পরও তিনি কার্যকর কোনো তথ্য দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্বজনদের।
# মানবপাচারের আশঙ্কা :
নিখোঁজ কিশোরের পরিবার আশঙ্কা করছে, তাকে কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকতে পারে। আসামিদের সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং আন্তঃসীমান্ত বা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সম্ভাব্য যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানানো হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে।
পরিবারের অভিযোগে আসামিদের একটি সংঘবদ্ধ যৌন ও অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।
# এক আসামি কারাগারে, অন্যজন আত্মগোপনে :
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার ২ নম্বর আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু ১ নম্বর আসামি এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ১নং আসামিকে গ্রেপ্তার করা গেলে ভিকটিমের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে পরিবার মনে করেন।
# স্বজনদের প্রশ্ন :
একজন কিশোর নিখোঁজ হওয়ার এতদিন পরও সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না কেন?
পরিবারের দাবি, আত্মগোপনে থাকা আসামিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আরবিতের নিখোঁজ হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
# তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ :
নিখোঁজ কিশোরের পরিবার তদন্ত কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আরবিতকে উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
পরিবারের দাবি, সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR), সম্ভাব্য লোকেশন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দ্রুত অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। পরিবারের অভিযোগ, তারা বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়ালেও তদন্তের দিক থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা ও অগ্রগতি পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় তদন্তে গাফিলতি হয়েছে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
“সন্তান কোথায়, জানি না”—কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা-বাবা
আরবিতের মা-বাবার কাছে এখন প্রতিটি দিন যেন অনন্ত অপেক্ষা। কখনো ফোন বেজে উঠলে তারা মনে করেন—হয়তো তাদের সন্তানের কোনো খবর এসেছে। আবার অচেনা কোনো খবর শুনলেই ছুটে যান।
স্বজনরা জানান, আদরের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার পিতামাতা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সন্তান কোথায় আছে, কার কাছে আছে, কী অবস্থায় আছে—কোনো প্রশ্নের উত্তরই তাদের জানা নেই।
তাদের একটাই দাবি—“আমরা বিচার চাই, কিন্তু তার আগে আমাদের সন্তানকে জীবিত ও নিরাপদ অবস্থায় ফিরে পেতে চাই।”
# স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ দাবি :
নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন পরিবার।
তাদের দাবি, মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা, আত্মগোপনে থাকা আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, আসামিদের মোবাইল ফোন ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য মানবপাচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বিশেষ করে কিশোরটির সঙ্গে আসামিদের পূর্ব যোগাযোগ, তাকে বিভিন্ন সময় উপহার ও অর্থ দেওয়ার অভিযোগ এবং নিখোঁজ হওয়ার দিনের যোগাযোগের তথ্য যাচাই করার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
মছুদ মোহাম্মদ আরবিত এখন কোথায় এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। একজন স্কুলছাত্রের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দীর্ঘ সূত্রতা আরও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন পরিবার এবং স্থানীয়রা। দ্রুত তদন্ত শেষ করে নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারের দাবি এখন তাদের প্রধান আকুতি।



